অনলাইন জুয়া ও মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ; তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
খোরশেদুল ইসলাম | গণমাধ্যমকর্মী।
কক্সবাজারের পেকুয়ায় তরুণদের একটি অংশের মধ্যে অনলাইন জুয়া, স্থানীয় ভাবে পরিচিত ‘বেট’, এবং বিভিন্ন মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় অনলাইন জুয়ার প্রতি তরুণদের আগ্রহ যেমন বাড়ছে, তেমনি ইয়াবা, গাঁজা ও মদসহ বিভিন্ন মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও শঙ্কিত অভিভাবক ও সচেতন মহল।
শুরুটা অনেক সময় হয় কৌতূহল কিংবা বিনোদন হিসেবে। অল্প টাকার ‘বেট’ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে কেউ কেউ জড়িয়ে পড়তে পারে জুয়ার আসক্তিতে। হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় বাড়তে থাকে ঝুঁকি, তৈরি হয় আর্থিক সংকট ও পারিবারিক অশান্তি। অন্যদিকে মাদকের সংস্পর্শ একজন তরুণের শিক্ষা, কর্মজীবন, পরিবার ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আগে জুয়া খেলতে নির্দিষ্ট জায়গায় যেতে হতো, এখন স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘরে বসেই বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে জড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বন্ধুদের প্ররোচনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা কিংবা দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন অনেক তরুণকে আকৃষ্ট করতে পারে। প্রথমে অল্প অর্থ দিয়ে শুরু হলেও জিতলে আরও বেশি লাভের আশায় এবং হারলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার আশায় ঝুঁকি বাড়তে থাকে,একপর্যায়ে বিনোদন হয়ে উঠতে পারে অভ্যাস, আর অভ্যাস থেকে তৈরি হতে পারে আসক্তি।
অনলাইন জুয়ার পাশাপাশি মাদকও তরুণ সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইয়াবা, গাঁজা ও মদসহ বিভিন্ন মাদকের অপব্যবহার ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি পরিবার ও সমাজেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অস্বাভাবিক অর্থের প্রয়োজন, পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া কিংবা মোবাইল ফোন ব্যবহারে অতিরিক্ত গোপনীয়তা—এসব পরিবর্তন দেখলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মাদক ও অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।তবে কেবল শাসন বা বকাঝকা নয়, সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি, তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করাও জরুরি।
একটি এলাকায় মাদক বা জুয়ার বিস্তার হঠাৎ করে তৈরি হয় না। সচেতন নাগরিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না, কোনো অনিয়ম বা অপরাধের তথ্য থাকলে যথাযথ প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোই দায়িত্বশীল কাজ।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠন ও যুবসমাজকে সমন্বিতভাবে সচেতনতা তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে।
মাদকের উৎস, সরবরাহকারী ও বিক্রয়চক্র শনাক্ত করে নিয়মিত আইনানুগ অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধেও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি প্রয়োজন।
ডিজিটাল লেনদেন, সন্দেহজনক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুয়া প্রচারণার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে যেকোনো পদক্ষেপ হতে হবে নিরপেক্ষ, তথ্যনির্ভর ও প্রমাণভিত্তিক। প্রকৃত অপরাধী ও সংশ্লিষ্ট চক্রকে আইনের আওতায় আনাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
আসক্ত তরুণদের ঘৃণা বা সামাজিকভাবে একঘরে না করে পরিবার ও সমাজের সহযোগিতায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। একইভাবে অনলাইন জুয়ার আসক্তদেরও ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন।
শুধু মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তরুণদের সামনে বিকল্প ও ইতিবাচক পথ তৈরি করতে হবে।
খেলাধুলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
একজন তরুণ যখন শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখে, তখন ক্ষতিকর ও অনিশ্চিত পথে আকৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে।
মাদক ও অনলাইন জুয়া কোনো একক পরিবারের সমস্যা নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পেকুয়ার তরুণদের কেউ কৃষক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা সমাজের নেতৃত্বদানকারী মানুষ হতে পারে। তাদের সম্ভাবনাকে ধ্বংসের পথে না ঠেলে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবার।
মোবাইল ফোন যেমন অনলাইন জুয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি সেই মোবাইলই শিক্ষা, জ্ঞান, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।
সিদ্ধান্ত আমাদের—তরুণদের হাতে আমরা কোন পথ তুলে দেব?
পেকুয়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের অন্ধকার কিংবা অনলাইন জুয়ার ফাঁদে নয়, জ্ঞান, দক্ষতা ও সম্ভাবনার আলোয় দেখতে চাই। সেই পরিবর্তনের শুরু হতে হবে আজ, এখনই।
লেখক: খোরশেদুল ইসলাম
পরিচয়: গণমাধ্যমকর্মী
তারিখ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
