শিলখালী ইউনিয়নে আগাম নির্বাচনী হাওয়া, সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের তৎপরতা বাড়ছে
পেকুয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ৭ নম্বর শিলখালী ইউনিয়নে আগাম নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এখনো নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা হয়নি। এরই মধ্যে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা মাঠে তৎপরতা বাড়িয়েছেন। কেউ প্রকাশ্যে, কেউবা নীরবে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্নভাবে সহযোগিতা দেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিলখালী ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশি ভোটারের বসবাস জারুলবুনিয়া এলাকায়। এ কারণে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নজরও এখন এ এলাকার দিকে। স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে জারুলবুনিয়াকে ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘ভোটব্যাংক’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটারদের আলোচনায় শুধু প্রার্থী কিংবা ভোটের হিসাব-নিকাশই নয়, উঠে আসছে এলাকার দীর্ঘদিনের বিরোধ, সংঘাত, মাদক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ও। ভোটারদের বড় একটি অংশ বলছেন, উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকায় শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন—এমন প্রার্থীই তাদের কাছে অগ্রাধিকার পাবেন।
শিলখালী ইউনিয়ন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়নের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় এবং হযরত শাহ খিজির (রহ.)-এর জন্মস্থান ও কবর এ এলাকার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে ইউনিয়নের পাহাড়ি এলাকাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে জমির সীমানা, সরকারি রিজার্ভ জমি এবং স্থানীয়ভাবে ‘মাথাখিলা’ নামে পরিচিত জমির দখলসহ বিভিন্ন বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। এসব বিরোধকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছরে জারুলবুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় সংঘাত ও বিরোধের ঘটনায় ৭ থেকে ৮ জন নিহত হয়েছেন। তবে এসব মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও ঘটনার কারণ সংশ্লিষ্ট নথি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে নতুন করে জমি কেনা ও বসতি স্থাপনের কারণে জনসংখ্যা বাড়ছে। এর সঙ্গে জমি ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধও তৈরি হচ্ছে।
শিলখালী ইউনিয়নের কাছারি মোড়সংলগ্ন কসাইপাড়া এলাকাকে ঘিরেও স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগ। এলাকাটিতে মারামারি ও মাদক কারবারের অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি কসাইপাড়ায় পেকুয়া থানা পুলিশের একটি বড় দল অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশের এমন অভিযানে স্বস্তি ফিরলেও স্থানীয়দের দাবি, মাদক ও অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের পুরোপুরি দমন না হওয়ায় তাদের মধ্যে এখনো আতঙ্ক রয়েছে।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য, নির্বাচনের আগে শুধু ভোট চাওয়া নয়, নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকায় মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতিও প্রার্থীদের কাছ থেকে তারা চান।
উপজেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শিলখালী ইউনিয়নে মোট ৯টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ৩টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড রয়েছে। ইউনিয়নে মোট ভোটকেন্দ্র ৯টি এবং ভোটকক্ষ ২৬টি। এর মধ্যে একটি ভোটকক্ষ অস্থায়ী।
ইউনিয়নে মোট ভোটার ১৩ হাজার ২৯৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ৭ হাজার ৫৬ জন এবং নারী ভোটার ৬ হাজার ২৩৮ জন।
ভোটার সংখ্যার দিক থেকে জারুলবুনিয়া গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আসন্ন নির্বাচন ঘিরে এ এলাকার ভোটারদের মতামত ও অবস্থান প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও স্থানীয়ভাবে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন—বর্তমান চেয়ারম্যান কামাল হোছাইন, সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল হোছাইন, শিলখালী ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুর রশিদ বিএ, নাহার এগ্রো গ্রুপের ডিজিএম আলাউদ্দিন চৌধুরী, পেকুয়া উপজেলা কৃষক দলের সভাপতি আবু সিদ্দিক রনি, ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইলিয়াস, ব্যাংকার নুরুল মোস্তফা এবং ব্যবসায়ী এম এ কাইয়ুম ইশতিয়াক।
তবে তফসিল ঘোষণার পর প্রার্থিতা, দলীয় সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচন ঘিরে শিলখালীর বিভিন্ন এলাকায় ভোটারদের মধ্যে শুরু হয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ। তবে স্থানীয়দের বড় অংশের প্রত্যাশা, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি শুধু রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না; এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবেন।
জারুলবুনিয়াসহ পুরো ইউনিয়নের ভোটাররা বলছেন, সংঘাত-সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা, মাদক ও অপরাধ দমনে কঠোরতা এবং সবার জন্য ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ আচরণ—এসব বিষয় আগামী নির্বাচনে প্রার্থীদের মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হতে পারে।
তাদের ভাষ্য, ভোটের সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেয়ে নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই হবে জনপ্রতিনিধির প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।
This theme has been developed by OURISLABD.