অনলাইন জুয়া ও বেটিং দমনে নতুন আইন: সর্বোচ্চ ১০ বছর জেল ও ৫ কোটি টাকা জরিমানা
খোরশেদুল ইসলাম:
দেশে অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের বিস্তার রোধে যুগোপযোগী ও কঠোর নতুন আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। প্রায় ১৫৯ বছর আগের ঔপনিবেশিক আমলের ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট, ১৮৬৭’ রহিত করে কার্যকর করা হয়েছে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’।
রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর গত বুধবার (১ জুলাই) আইনটি জারি করে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই দেশজুড়ে এই আইনটি কার্যকর হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
নতুন আইনে প্রথমবারের মতো অনলাইন জুয়া, অনলাইন বেটিং, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল বেটিং, ফ্যান্টাসি বেটিং, ই-স্পোর্টস বেটিং, ডিজিটাল গ্যাম্বলিং প্ল্যাটফর্ম, ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, ঘোস্ট সিম, ভুয়া এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ম্যাচ ফিক্সিং এবং স্পট ফিক্সিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থাকাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ক্লাউডভিত্তিক অবকাঠামো, ভিপিএন বা অন্য কোনো প্রযুক্তিগত মাধ্যম ব্যবহার করে জুয়া বা বেটিং পরিচালনা করা, অ্যাকাউন্ট খোলা, অর্থ জমা, উত্তোলন কিংবা স্থানান্তর করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া বিদেশি অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধি, এজেন্ট বা সহযোগী হিসেবে কাজ করাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নতুন আইনে অপরাধের তীব্রতা অনুযায়ী শাস্তির বিভিন্ন ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে:
সাধারণ জুয়া: সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড অথবা ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড।
অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া: সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড অথবা ১ কোটি টাকা জরিমানা।
অনলাইন বেটিং ও নেটওয়ার্ক পরিচালনা: অনলাইন বেটিং, বুকমেকার হিসেবে কাজ করা বা ভিপিএন/মিরর সাইট ব্যবহার করে জুয়ার নেটওয়ার্ক পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড।
ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিং: ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ১ কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা। অপরাধীকে নির্দিষ্ট মেয়াদে বা স্থায়ীভাবে খেলাধুলা থেকে নিষিদ্ধ করতে পারবেন আদালত।
বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা: জুয়ার বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ, বা ইনফ্লুয়েন্সার/তারকাদের মাধ্যমে প্রচারণার জন্য গণমাধ্যম, শিল্পী বা খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড অথবা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে।
সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অর্থপাচার: ভুয়া/ঘোস্ট সিম বা অন্যের এনআইডি ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার অপরাধে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা। তবে এটি সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে করা হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে।
জুয়ার অর্থ ব্যাংক, এমএফএস, ডিজিটাল ওয়ালেট, হাওলা, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে স্থানান্তর বা বৈধ করার চেষ্টাকে 'মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২'-এর সম্পৃক্ত অপরাধ (প্রিডিকেট অফেন্স) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে অপরাধীদের মানি লন্ডারিং আইনেও বিচার করা হবে।
নতুন আইনে আদালতকে অপরাধে ব্যবহৃত বা অপরাধলব্ধ ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম এবং ডিভাইসসহ সব ধরনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। জুয়ার আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত ভবন, অফিস বা কল সেন্টারও বাজেয়াপ্ত করা যাবে।
কোনো কোম্পানি বা পেমেন্ট গেটওয়ে এই অপরাধে জড়িত থাকলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক বা ব্যবস্থাপকদের দায়ী করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত ও বাতিল করতে পারবেন আদালত। আইনের অধীনে অনলাইন জুয়া ও সাইবার অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে এবং অন্যান্য অপরাধের বিচার হবে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী।
আইনে সব অপরাধকে আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য এবং আপস অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন, এমন পুলিশ কর্মকর্তা এসব অপরাধের তদন্ত করবেন এবং আদালতের অনুমতি নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্তের ব্যাংক বা ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ (স্থগিত) করতে পারবেন।
অনলাইন জুয়া প্রতিরোধে সরকারকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন (DPI), ট্রানজ্যাকশন মনিটরিং সিস্টেম ও ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহারের আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট ডেটাবেজ ও বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা হবে।
আইনটি বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি, বাংলাদেশ ব্যাংক (বিএফআইইউ), নির্বাচন কমিশন, সিআইডি এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সিসহ বিভিন্ন সংস্থাকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন আইন কার্যকরের মাধ্যমে ১৮৬৭ সালের পুরনো আইনটি রহিত হলেও, পূর্ববর্তী আইনের অধীনে চলমান মামলা ও আইনি কার্যক্রম নতুন আইনের বিধান অনুযায়ীই অব্যাহত থাকবে।
This theme has been developed by OURISLABD.
Post a Comment