চকরিয়া-পেকুয়ায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ: পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু, পানিবন্দি ২ লাখ মানুষ
টানা ৫ দিনের ভারী বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদী থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ভাঙা বেড়িবাঁধ এবং কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় দুই উপজেলার অন্তত ২ লাখ মানুষ বর্তমানে পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে চকরিয়ায় পাহাড়ধসে একই পরিবারের দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নদীর পানি উপচে চকরিয়া পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডসহ উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে কাকারা, সুরাজপুর-মানিকপুর, বরইতলী, কোনাখালী ও বিএমচর ইউনিয়নের সড়ক এবং বসতবাড়ি বর্তমানে ৩-৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে আছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১১টার দিকে চকরিয়ার মচইন্যাকাটা এলাকায় পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে এক মর্মান্তিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে মাটিচাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই এক শিশু ভাই-বোনের মৃত্যু হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে পাহাড়ি এলাকার অধিবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে অনুরোধ জানাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
সরেজমিনে তদন্তে জানা গেছে, এই বিস্তীর্ণ এলাকায় তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার পেছনে প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মানবসৃষ্ট দুর্যোগই প্রধান দায়ী। চকরিয়া ও পেকুয়ার অভ্যন্তরীণ খাল এবং পানি নিষ্কাশনের কালভার্টগুলো দখল করে অবৈধ মাছের ঘের ও স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বেড়িবাঁধের শতাধিক স্থানে অবৈধভাবে মাটি কেটে মাছ ধরার ফাঁদ (নাসি) স্থাপন করা হয়েছে। পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম পাউবোর ৫১টি স্লুইচ গেট প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দখলে থাকায় বর্ষার পানি নামতে পারছে না। ফলে বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিজমি, পানের বরজ এবং মৎস্য ঘেরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বরইতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী (৪৫) আক্ষেপ করে বলেন, "ঘরের ভেতর ৩ ফুট পানি। রান্না করার কোনো উপায় নেই, বাচ্চার খিদের জ্বালায় কাঁদছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি খাল দিয়ে নামতে পারছে না, কারণ প্রভাবশালীরা কালভার্ট আর খালের মুখ বন্ধ করে মাছের ঘের বানিয়েছে। আমরা প্রতি বছর পানিতে ভাসি, কিন্তু প্রশাসন এই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে না।"
পেকুয়া উপজেলার ৩টি এবং চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের ১টি স্থানে পাউবোর বেড়িবাঁধ ভেঙে সরাসরি লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। পেকুয়ায় মাতামুহুরী নদী ও বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন ১২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধের শতাধিক স্থানে বেআইনি 'নাসি' বসানোর কারণে বাঁধটি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পেকুয়ার ৫৪টি স্লুইচ গেটের মধ্যে সচল ৫১টির অধিকাংশেরই কোনো বৈধ ব্যবস্থাপনা কমিটি নেই। মগনামা, রাজাখালী, উজানটিয়া, পেকুয়া সদর ও টইটং ইউনিয়নে শুষ্ক মৌসুমে লবণ চাষ এবং বর্ষা মৌসুমে মাছের ঘের বা ধান চাষের পানি নিয়ন্ত্রণ করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে এই সিন্ডিকেট।
রাজাখালী এলাকার পরিবেশকর্মী ও সামাজিক সংগঠক সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, "পেকুয়া ও চকরিয়ার এই বন্যা পুরোপুরি মানবসৃষ্ট। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা সিন্ডিকেট স্লুইচ গেটগুলো কব্জা করে রেখেছে। তারা নিজেরা লাভবান হতে লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপন্ন করছে। অবৈধ 'নাসি' ও স্লুইচ গেট উচ্ছেদ না করলে এ অঞ্চলকে বন্যা থেকে বাঁচানো সম্ভব নয়।"
পরিস্থিতির তীব্রতা স্বীকার করে পেকুয়া এলাকার পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী জমির উদ্দিন বলেন, "আমাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় অবৈধ নাসি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ৩টি গেট ধ্বংস হওয়ার পর ৫১টি সচল আছে, যার মধ্যে মাত্র ৬টির বৈধ কমিটি রয়েছে; বাকিগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীরা নিয়ন্ত্রণ করছে।"
উদ্বুত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে এবং আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Post a Comment