কক্সবাজারে চাঞ্চল্য: ধর্ষণের শিকার কিশোরীর ছবি ফেসবুকে দিলেন ওসি, জনরোষ
চকরিয়া প্রতিনিধি:
আইনের রক্ষক হয়ে খোদ ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেনের বিরুদ্ধে। চকরিয়া থানায় দায়ের হওয়া একটি ধর্ষণ মামলার ১৪ বছর বয়সী এক ভিকটিম কিশোরীর ওড়না সরানো আপত্তিকর ছবি তুলে তা থানার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করার পর জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
গত সোমবার রাতে ছবিটি পোস্ট করার পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। তীব্র সমালোচনার মুখে একপর্যায়ে থানার ফেসবুক পেজটি ডিঅ্যাক্টিভেট (বন্ধ) করতে বাধ্য হয় পুলিশ।
মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদগাঁও উপজেলার এক কিশোরীকে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগে চকরিয়া থানায় মামলা করেন তার বাবা। গত ৩০ মে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে। ভিকটিমকে থানায় নিয়ে আসার পর ওসির রুমে এক চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, ওসি মনির হোসেন নিজেই ওই কিশোরীর বুকের ওড়না সরিয়ে পাশের আসবাবপত্রের ওপর রাখেন এবং নিজের মোবাইল দিয়ে ভিকটিমের ছবি তোলেন। সোমবার রাতে আসামিপক্ষের সমালোচনাকারীদের জবাব দিতে এবং একটি বিতর্কিত ঘটনা থেকে জনদৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ওসির নির্দেশে সেই ছবি বিবরণীসহ ফেসবুক পেজে পোস্ট করা হয়।
নির্যাতিতা কিশোরীর বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,পুলিশ আমার মেয়েকে উদ্ধার করার পর হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। কিন্তু ফেসবুকে আমার মেয়ের ছবি দিয়ে তাকে এভাবে সবার সামনে ছোট করা হবে, তা ভাবিনি। এ বিষয়ে আমার বা আমার পরিবারের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।"
পুলিশের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি চকরিয়া থানার এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) কর্তৃক এক ব্যক্তিকে থানায় এনে বেধড়ক পেটানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় তীব্র সমালোচনার মুখে জেলা পুলিশ অভিযুক্ত এসআই-কে প্রত্যাহার করে। তবে ওই নির্যাতনের নেপথ্য নির্দেশদাতা হিসেবে ওসির অপসারণ ও শাস্তির দাবি জোরালো হয়ে উঠছিল। মূলত সেই মূল অপরাধ ও সমালোচনা থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই ওসি মনির হোসেন ভিকটিম কিশোরীর ছবি প্রকাশের এই ‘ডাল-ভাত’ অপকৌশলের আশ্রয় নেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
বাংলাদেশের প্রচলিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, অপরাধের শিকার হওয়া কোনো নারী বা শিশুর ছবি, নাম, ঠিকানা বা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, যা তাকে সমাজে চিহ্নিত করতে পারে। এই আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের স্পষ্ট বিধান রয়েছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি, আবদুল মান্নান বলেন:
"আইনের রক্ষক হিসেবে ওসির এই আচরণ শুধু দুঃখজনকই নয়, সরাসরি বিদ্যমান আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন ও ফৌজদারি অপরাধ। তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।"
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী একে ভিকটিমের প্রতি ‘দ্বিতীয় দফা অবিচার’ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে উল্লেখ করে অবিলম্বে ওসির অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, ওসির এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হলে বা সংবাদ প্রকাশ করতে চাইলে তাদেরকে ‘ডাকাতি ও ইয়াবা মামলায় ফাঁসানোর’ হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করছেন তিনি। এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য ওসির মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, "থানার ফেসবুক পেজে ভিকটিমের ছবি দিয়ে ঠিক করেননি ওসি। এটি আইন পরিপন্থি এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।"
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান জানান, ঘটনাটি তিনি অবগত হয়েছেন এবং দ্রুত জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) সঙ্গে কথা বলে সংশ্লিষ্ট ওসির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

Post a Comment