জেলের চার দেয়ালে বন্দী থেকেও ডাকাতি মামলার আসামি! চকরিয়া পুলিশের তদন্তে গুরুতর অসঙ্গতি
চকরিয়া প্রতিনিধি:
কারাগারের চার দেয়ালে বন্দী থাকা এক ব্যক্তিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখিয়ে নতুন একটি ডাকাতি মামলায় আসামি করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের চকরিয়া থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশের এই তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয় সচেতন মহলে। প্রকৃত অপরাধী আড়াল করে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করার এই ঘটনাটি তদন্তের স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বকে বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।অভিযুক্ত আসামির নাম আবুল বশর। তিনি চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের হাফালিয়াকাটা মোরাপাড়া এলাকার নুরু সওদাগরের পুত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছর (২০২৫ সালের) ২৩ মার্চ চকরিয়া থানার একটি ডাকাতি মামলায় (জিআর-১৩৪/২০২৫, দণ্ডবিধি ৩৯৫/৩৯৭ ধারা) পুলিশ আবুল বশরকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে। আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেই থেকে টানা ৩ মাস ৪ দিন ধরে তিনি ধারাবাহিকভাবে কারাবন্দী রয়েছেন।অথচ বিস্ময়করভাবে, তিনি কারাগারে থাকা অবস্থাতেই গত ২৪ মে ২০২৫ তারিখে চকরিয়া থানায় আরেকটি নতুন ডাকাতি মামলা (মামলা নং-৫৮) দায়ের করা হয়। এই মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঘটনার সময় আবুল বশর সশরীরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অপরাধ সংঘটিত করেছেন। কারাগার রেজিস্টার ও হাজতি তালিকার তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ও সময়ে তিনি সম্পূর্ণভাবে জেলহাজতের ভেতরেই ছিলেন।স্বজনদের অভিযোগ ও ক্ষোভ আবুল বশরের পরিবারের দাবি, তিনি যে আগে থেকেই কারাগারে আছেন, তা পুলিশ খুব ভালো করেই অবগত। শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করার জন্য তাকে এই সাজানো মামলায় জড়ানো হয়েছে।
কারাগারে থাকা ব্যক্তি কীভাবে বাইরে এসে পুনরায় ডাকাতি করতে পারে, তা নিয়ে তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এই বিষয়ে চকরিয়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) এডভোকেট মঈন উদ্দিন বলেন:"কারাগারে থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে নতুন মামলায় সশরীরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখিয়ে আসামি করা আইনি প্রক্রিয়ায় বড় জটিলতা তৈরি করে। পুলিশ যদি যাচাই-বাছাই না করে এমনটি করে থাকে, তবে তা সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার।"আইন বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের দায়সারা ও ত্রুটিপূর্ণ তদন্তের কারণে বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয় এবং হয়রানিমূলক মামলার সুযোগ তৈরি হয়।
এই বিষয়টা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে চকরিয়া সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) অভিজিৎ দাশ জানান, কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে থাকলে তার পক্ষে বাইরে কোনো অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। পুলিশের কাজে যদি কোনো ভুল বা তদন্তকারী কর্মকর্তার গাফিলতি থাকে, তবে আদালত সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।তবে এই ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা চকরিয়া থানার তৎকালীন ওসি শফিকুল ইসলাম এবং মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আরকানুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যান।তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী বিতর্ক উল্লেখ্য, এই বিতর্কিত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আরকানুল ইসলামের বিরুদ্ধে বেপরোয়া তাণ্ডবের পুরনো অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি গত ৩০ মে (শনিবার) এক নারী ভিকটিমকে উদ্ধার করতে গিয়ে বেধড়ক লাঠিচার্জের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে চকরিয়া থানা থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে কক্সবাজার জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।ভুক্তভোগী পরিবার ও চকরিয়ার সচেতন মহল এই সাজানো মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
This theme has been developed by OURISLABD.
Post a Comment