শিরোনাম ::
শিরোনাম ::

ভুল-ত্রুটির শাস্তি শাসন হতে পারে, পশুবৃত্তি বা হত্যা নয়

প্রকাশঃ
প্রসেসিং হচ্ছে, দয়া করে অপেক্ষা করুন...

রেজাউল করিম রেজা, সংবাদকর্মী 

​১৫ বছরের একটি কিশোরী ঘর থেকে পালিয়ে গেলে, না জানিয়ে কোথাও ঘুরতে গেলে কিংবা প্রেম করলে তাতে অভিভাবকত্ব বা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তাকে শাসন করার অধিকার হয়তো পরিবারের রয়েছে। কড়া ভাষায় বকা দেওয়া যায়, ঘরে আটকে অভিভাবকের হাতে তুলে দেওয়া যায়, কিংবা ভুল শুধরে দেওয়ার জন্য যেকোনো অভিভাবকসুলভ কঠোরতা দেখানো যেতে পারে। মেয়েকে সঠিকভাবে শাসন না করার অভিযোগে পিতামাতাকেও হয়তো দু-একটা কটূ কথা শুনতে হতে পারে।

​কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তার ওপর কোনো নৃশংসতা চালানো যায় না। তাকে ধর্ষণ করা যায় না, শরীর কেটে দু-ভাগ করে গাছে ঝুলিয়ে দেওয়া যায় না, ধানক্ষেতে পুঁতে ফেলা যায় না কিংবা তার জীবন কেড়ে নেওয়া যায় না।

​আজ যারা এই ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করার জন্য হাজারটা অজুহাত বা ‘নসিহত’ নিয়ে আসেন, তারা কি একবারও ‘কর্মা’ কী জিনিস তা ভেবে দেখেছেন? আজ আপনি যেভাবে অন্যের স্ত্রী, কন্যা, মাতা কিংবা বোনকে হিংস্রতার শিকার বানাচ্ছেন বা তা সমর্থন করছেন-আপনি চান বা না চান, একই হিংস্রতা কোনো না কোনোভাবে আপনার নিজের পরিবারের নারীদের ওপরও ফিরে আসবে। কারণ এই সামাজিক সহিংসতার কোনো নির্দিষ্ট ফিল্টার নেই যা আপনার পরিবারকে নিরাপদ রাখবে। এই সমাজটাই আজ হিংস্রতার বিষবাষ্পে আচ্ছন্ন। আপনারা নিজেরাও তা ভালো করেই জানেন; আর জানেন বলেই বাড়ির মেয়ে, স্ত্রী বা প্রেমিকা একটু বাইরে গেলে, স্কুল থেকে ফিরতে সামান্য দেরি হলে কিংবা সন্ধ্যা পার হলে অস্থির হয়ে ওঠেন। সেই অস্থিরতা কোনো কাল্পনিক জম্বি বা জুজুর ভয়ে নয়-সেই ভয়টি এই পচে যাওয়া সমাজেরই বাস্তব রূপ।

​সংবাদপত্রের পাতা উল্টালেই এই বীভৎসতার যে নির্মম প্রমাণ মেলে, তা বিবেককে স্তব্ধ করে দেয়। লালমাইয়ের তাজমিনের দেহ যখন উদ্ধার করা হয়, তখন তার আশপাশের ৪-৫টি ধানক্ষেতের ধানগাছ ভাঙা ছিল। মৃত্যুর আগে বাঁচার জন্য তার তীব্র দৌড়াদৌড়ি আর ধস্তাধস্তির চিহ্নগুলো স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয় সে কতটা ভয়ংকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল। মানিকগঞ্জের স্কুলছাত্রী মারিয়ার ক্ষেত্রেও নিখোঁজ হওয়ার পর ঝোপ বা ফাঁকা স্থান থেকে তার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। কিংবা মুখটা এসিডে ঝলসানো অবস্থায় গাছে ঝুলে থাকা তরুণী-এগুলো শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন সংবাদ নয়, আমাদের পচে যাওয়া বিচারব্যবস্থা ও সমাজের দলিল।

​এই মেয়েগুলোর তথাকথিত 'অপরাধ' ছিল কিশোরী বয়সের কিছু স্বাভাবিক চঞ্চলতা বা ভুল পদক্ষেপ-কেউ প্রেম করেছিল, কেউ বা একটু ঘুরতে গিয়েছিল। এই দুটোর কোনটির শাস্তিই কিন্তু মৃত্যুদণ্ড বা এমন পাশবিক নির্যাতন হতে পারে না।

​অথচ আমাদের সমাজে প্রকৃত অপরাধীরা দিব্যি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়ায়। ৫ বছরের পূজার ওপর পাশবিক নির্যাতনকারী কিংবা রামিসা ও আছিয়াদের চরম নৃশংসতায় হত্যাকারীরা আইনের ফাঁক গলে পার পেয়ে যায়, কিংবা সমাজ তাদের জন্য কঠোর শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয় না।

​এর পাশাপাশি রয়েছে আমাদের সমাজের এক অদ্ভুত দ্বিমুখী নীতি। কোনো কিশোরী বা নারী সহিংসতার শিকার হলে সাথে সাথে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, তার বাবা-মায়ের লালন-পালন নিয়ে জাজমেন্ট শুরু হয়। অপরাধী পুরুষকে বাঁচানোর জন্য সমাজ নানা মুনির নানা মত বা অজুহাত খাড়া করে। জন্ম থেকেই এ দেশে মেয়েদের 'লক্ষ্মী' হওয়ার অবাস্তব ছকে বাঁধার শিক্ষা দেওয়া হয়। তবে সেই 'লক্ষ্মী' মেয়েটি একটু চঞ্চলা হলেই বা ছকের বাইরে পা রাখলেই তার ওপর চরম নৃশংসতা চালানো হয় এবং পরবর্তীতে সেই হত্যার জাস্টিফিকেশন বা অজুহাত দাঁড় করানো হয়।

​ভুল বা অপরাধের শাস্তি শাসন হতে পারে, কিন্তু কখনোই পশুবৃত্তি বা মৃত্যু হতে পারে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি, অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার মানসিকতা বন্ধ না হলে, এই হিংস্রতার আগুন থেকে কারও পরিবারই শেষ পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে না।

​

This theme has been developed by OURISLABD.
শিরোনাম...

এই খবরের অডিও ভার্সন শুনতে নিচের প্লে বাটনে ক্লিক করুন

0:00 / 0:00 0%